স্বর্ণতারকা রহস্য, চতুর্থ পর্ব ।
The Adventure of The Golden Star, part 4
চতুর্থ পর্ব
(৯)
বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছালাম অরুনবাবুর বাড়ি। ইতিমধ্যে ভদ্রলোকের শারিরীক উন্নতি বেশ লক্ষ্যনীয়। তবে তাঁকে বেশ চিন্তিত মনে হল। তিনি বললেন, “কিছু হল নারায়ণ ? এদিকে যে মেজোখোকা এসে বলছে আমাদের বুড়ো-বুড়ি দু'জনকে ওর সাথে নিয়ে যাবে । এই বয়সে এই রকম আতঙ্ক সত্যি সহ্যও হয়না আর। আবার এদিকে এই বাক্সটা-কিছু বুঝে উঠতে পারছিনা কি করবো । কাল নাকি বাড়ির আশেপাশে কয়েকজনকে ঘোড়াঘুড়ি করতেও দেখা গেছে ।“
ভদ্রলোক বরুদার দিকে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন- “বাক্সটা থেকে কিছু পেলেন আপনারা ?”
বরুদা আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে অনিকের কাঁধের ঝোলা থেকে বাক্সটা বের করতে ইশারা করল । বাক্সটা বৃদ্ধের কম্পমান হাতে দিয়ে বললো-
“অরুনলাল বাবু, আপনার বাক্স থেকে আপাতত কিছু পাইনি আমরা । বলতে পারেন সাহস হয়নি- কিংবা বলতে পারেন যথাযথ উপায়টা এইটুকু সময়ের মধ্যে বের করাটা খুবই কঠিন কাজ ।“
“ওহ্...তাহলে এখন উপায় কি ?”
ভদ্রলোক আরও কিছু বলতে উদ্যত হলেন কিন্তু তার আগে আমি স্থিরকন্ঠে বললাম, “উপায় একটাই, আপনার ছেলেদের ডাকুন- ওনাদেরও জানা দরকার আপনি গত কুড়ি বছর ধরে কোন জিনিসটা যকের ধনের মতো আগলে রেখেছেন- এখন থেকে পুরো পরিবার মিলে নাহয় সেটা রক্ষা করবেন; আমার বিশ্বাস এতে কাজ হবেই ।“
“কিন্তু...”
“কোনো কিন্তু নয় অরুনলাল বাবু...। আমরা অনেক ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি ।“
“আচ্ছা, আপনারা যা বলবেন...।“
“অতএব, আপনি এখনি আপনার তিন ছেলেকেই এখানে ডাকছেন । ভয় নেই এতে আপনার উপকারই হবে ।“ আমি কিঞ্চিত নম্রতার সাথেই বললাম ।
খানিক পর নিচের বসবার ঘরে সকলের জমায়েত বসল, অরুন বাবু, তাঁর তিন ছেলে, এবং আমরা । চাকর রামু এসে সকলকে চা দিয়ে গেল । নারায়ণবাবুর মারফৎই অরুনলাল বাবুর মেজো ছেলে লালকমল বাবুর সাথেও পরিচয় হল । তিনি বললেন, “আমি কিন্তু বাবা-মাকে আর এখানে রাখবোনা । কি বিচ্ছিরি ব্যাপার বলুন তো, এই বয়সে...। ওনাদের মানসিক অবস্থাটা কি জায়গায় পৌঁছোতে পারে ভাবুন একবার ।“
“আচ্ছা ঠিক আছে সে কথা এখন থাকনা । শান্ত হয়ে বসে কি করলে হয় তোরা ঠিক কর,আমি মেনে নেবো-তবে হ্যাঁ, আজ আমার কিছু জরুরী কথা বলার আছে ।“
মোহনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ”নারায়নবাবু কেসটার কিছু কিনারা করতে পারলেন ? এমন আস্পর্ধা যে কার হতে পারে আমিও দেখতে চাই ।“
নারায়নবাবু তার উত্তরে কিছু বলার আগেই আমাকে কিছু বলতেই হল, “মোহনবাবু আপনি হয়তো ঠিকই ধরেছেন- নিঃসন্দেহে নারায়নবাবু একজন বিচক্ষণ পুলিশ অফিসার । আপনাদের অপরাধীকে তিনি নিশ্চয় খুব শিঘ্রই ধরে ফেলবেন । তবে আমরা আজ আপনাদের যা বলার জন্য এখানে এসেছি তা একটু মন দিয়ে শুনুন ।
এক মুহুর্তেই সারা ঘরে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল । সকলে আমার দিকে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে থাকল, আমি আবার বলতে লাগলাম-
“আপনারা হয়তো জানেন- কুড়ি বছর আগে পর্যন্ত আপনাদের বাবা, অরুনবাবু একজন সনামধন্য ঐতিহাসিক প্রফেসর আর.কে.দাসের অধীনে বাংলার কিছু পুরোনো গুপ্তধন সংক্রান্ত রিসার্চের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। প্রফেসরকে খুন করেন আশিষ মাহাতো নামে আপনাদের বাবারই সহকর্মী । আপনাদের বাবা ছিলেন সেই খুনের প্রত্যক্ষদর্শী এবং একমাত্র সাক্ষী। তার ভিত্তিতে আশিষ মাহাতোর জেল হয় । এতদূর হয়তো আপনাদের সকলেরই জানা আছে, আশা করছি ।“
“হ্যাঁ, কিন্তু এসবের সাথে বর্তমানের কি সম্পর্ক ?”
“সম্পর্ক আছে এমনটাই আমাদের অনুমান...। অরুনবাবু বাকিটা নাহয় আপনিই বলুন...”
ধীর অথচ স্পষ্ট কন্ঠে সমস্ত ঘটনা তিনি আবার বললেন- যা যা তিনি ইতিপূর্বে আমাদের বলেছিলেন । কিভাবে সিন্দুকটি প্রফেসর তাঁর হাতে সঁপে ছিলেন- অরুনলালবাবুর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া- এবং কুড়ি বছর কিভাবে সবার অলক্ষে সিন্দুকটি আগলে রাখলেন ইত্যাদি ।
সমস্ত ঘটনা শোনার পর খানিক ক্ষন সকলেই চুপ । বড়ছেলে মোহনবাবু তাঁর বাবার কাছে উঠে গিয়ে প্রথম কথা বললেন, “এটা আমাদের আগে বলতে পারতে বাবা; তুমি কি নিজের ছেলেদেরও বিশ্বাস করনা ?”
“আমি যে কথা দিয়েছিলাম কাউকে এর ব্যপারে জানাবোনা। কাউকে না, তো কাউকেই না । ...চাইতাম না এই ঝামেলায় তোদেরও জড়াতে...। এই পরিস্থিতি না আসলে হয়তো আজও বলতাম না । তবে এনারা আমার চোখ খুলে দিয়েছেন- খুব শিঘ্রই আমি এটা সরকারের হাতে সোপর্দ করে দেবো- কোনো সরকারি সংস্থা এই নথিপত্রের সাহায্যে তাদের গবেষনা আবার শুরু করলে তবেই শান্তি পাবো
“বেশ উত্তম প্রস্তাব-“ বরুদা বললো ।
প্রস্তাবটা যে উত্তম তাতে আমারো কোনো সন্দেহ ছিলোনা । মনেমনে আমিও খুশি হলাম ।
“নারায়ন, তুমি কি বাক্সটা এখনি নিয়ে যাবে ? এটা আর নিজের কাছে রাখতে সাহস পাচ্ছি না । কি করলে হয় তোমরাই কর ।“
ভদ্রলোকের গলায় একই সাথে অস্বস্তি ও অস্থিরতার ছাপ । যেন দীর্ঘকাল যাবৎ কোনো এক বোঝা মাথায় বয়ে নিয়ে বেড়াতে বেড়াতে আজ সকল ধৈর্যের বান এক নিমেষেই ভেঙে যাওয়ার উপক্রম । ওঁনার ওপর কিছুটা মায়াই হচ্ছিলো ।
তিনি চাকর রামুকে হাঁক দিলেন এরং ওপরের ঘরের টেবিল থেকে বাক্সটা আনতে বললেন । বাক্স আনার অছিলায় আমিও রামুর সাথে ওপরে গেলাম । খানিক পর বাক্সটা নিয়ে আমরা নিচে নামলাম ।
“অদ্ভূত দৃশ্য, এনারা যে এরই মধ্যে গল্প জুড়ে দিয়েছেন ! তবে প্রকাশবাবুর মুখ কিছুটা ফ্যাকাশে লাগছিলো ।
এত কম সময়ের মধ্যেই যে দৃশ্যটা এতটা বদলাবে আশা করিনি । বাক্সটা যখন তাদের সামনে রাখা হল সকলেই সচমকিত দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন ।
(১০)
ঘটনাপ্রবাহ ধীরে ধীরে আমাদের গল্পের ক্লাইম্যাক্সে নতুন কিছু চমক যোগ করতে লাগলো । যেগুলো না ঘটলে আমাদের গল্পের এতটা রোমাঞ্চকর পরিসমাপ্তি হয়তো হতোনা । ঘটনাগুলো একে একে বর্ণনা করি ।
বাক্সটা অরুনলালবাবুর হাতেই সোপর্দ করে বরুদা বললো, “আপনারা এক কাজ করুন, এই বাক্সটা আপাতত আপনাদের কাছেই রাখুন আপনার ছেলেরা তো রয়েছেই এখন নাহয় পুরো পরিবার মিলেই এটার রক্ষা করুন ।“ দেখলাম অরুনলালবাবুর ছেলেরা তাতেই বেশি সম্মতি জানালেন ।
“লালকমল বাবু, আপনি বলছিলেন আপনার বাবা-মাকে নিয়ে পলাশীতে চলে যাবেন । সবকিছু শোনার পর এখনো কি আপনার সেই সিদ্ধান্তই থাকবে ?”
“আপনারাই বলুন না, ওনাদেরও বয়স হয়েছে । এতটা ধকল কি ওনাদেরও সইবে ? কয়েকটা দিন আমি এখানেই থেকে যাবো ভাবছি, তারপর ভালো বুঝলে আমি এনাদের সাথে নিয়েই চলে যাবো । এখানে এনাদের যত্নের যা নমুনা ।“
“আচ্ছা, সেটা আপনারা বসেই ঠিক করে নেবেন ।“
“নারায়নবাবু আপনি সেই দুঃসাহসকারীকে যত তাড়াতাড়ি পারেন সামনে আনুন ।“ চোখ দুটো লাল করে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন লালকমল বাবু ।
“আপনাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই । সে ব্যাটা পার পাবেনা ।“
বরুদা আবার বললো, “আর হ্যাঁ, যত দ্রুত সম্ভব আপনারা সিসিটিভি ক্যামেরাটা ঠিক করান । নারায়ণ তুমি এই বাড়ির সিকিউরিটির একটা ব্যাবস্থা করে দাও ।“
“আজ তো রবিবার, আজ রাতটা একটু সজাগ থেকে কাটিয়ে দিন । কাল সকাল থেকেই আমি এই এলাকার নিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে দেবো । আপনাদের বাড়ির নিরাপত্তার খাতিরে একজন পুলিশি নিরাপত্তারক্ষক নিযুক্ত করে দেওয়ার ব্যাবস্থা আমি করে দেবো । আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন ।“
“তাহলে সমস্ত কিছুই মিটে গেলো ।“
“কিন্তু সমস্ত কিছু মিটলো কই ?” এবার আরুনবাবুর বড়ছেলে মোহনলাল বললেন ।
“এমন একটা ঘটনা ঘটলো । আপনারাই বলছেন সতর্ক থাকতে । তারওপর এমন দুর্মূল্য এক বাক্স । অথচ বাড়িতে কোনো সিকিউরিটি থাকবেনা । এখনতো আমারও ভয় করছে । কোনো বিপদ যদি ঘটে যায় ।“
“মাত্র একটাদিন মোহনবাবু, একটা দিন আপনারা সতর্কিত ভাবে থাকুন । তারপর এই এলাকাতেও পুলিশি নিরাপত্তা আরও অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হবে । দেখছেনই তো কলকাতা শহর জুড়ে নতুন যে উপদ্রব শুরু হয়েছে । তার জন্য শহরজুড়ে সব জায়গাতেই নিরাপত্তা বাড়ানোর কাজ ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে কোলকাতা পুলিশের তরফ থেকে । এই এলাকাও তার থেকে বাদ যাবে না । আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি ।“
আমি মনেমনে খুবই খুশি ছিলাম । কারণ আমি ঠিক যেমনটা চাইছিলাম ঘটনাক্রম আমার জন্য ঠিক তেমনই পরিবেশ সাজিয়ে দিচ্ছিলো । দরজা থেকে বেরিয়ে আমরা একবার সিসিটিভি ক্যামেরাটার দিকে তাকালাম এবং বাগানের ভিতর হাঁতরে অনিক কিছুটা কাদামাখা একটা লাঠি তুলে আমাকে দেখলো । ওর ধারণা এটা দিয়েই ক্যামেরার দফা রফা করা হয়েছে । বরুদা আর আমার চিন্তাভাবনাও এতো দুর অবধি বেশ সমান্তরালেই চলছিলো । চাকর রামুর সাথে কিছু দরকারি কথা বলে নিয়ে আমরা যখন জিপে উঠবো ঠিক তখন কাঁচা-পাকা চুলওয়ালা থুত্তুরে এক বৃদ্ধ এসে হাজির । সকলে অবাক হলো যখন সে বৃদ্ধের মুখে অনাদি রায়ের নাম শুনলো । বৃদ্ধ কিছুটা ধরা ও কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন, “তুমি অনাদি রায় না ? মণীশ ভাদুড়ি তোমার কলেজমেট ছিলো না ?”
“হ্যাঁ,হ্যাঁ... মনুকে কে ভুলতে পারবে । কিন্তু আপনি ?”
“আমি মনুর বাবা হই । সম্প্রতি মনু তোমাদের কলেজ জীবনের অ্যালবাম নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে তোমার অনেক প্রশংসা করে । ভাবিনি তোমাকে এখানেই দেখতে পাবো । চলো না এই কাছেই আমরা থাকি । আমি ওখানেই যাচ্ছি । মনু তোমাকে দেখলে খুব খুশি হবে । চলুন না,চলুন ।“
বুঝলাম বৃদ্ধ ছাড়ার পাত্র নয় । হাত ধরে টানাহেঁচড়া করতে লাগলো । অনিকের দিকে চেয়ে মনে হলো সেও বেশ বিরক্ত বোধ করছে । বরুদা আরও বেশি অবাক হলো যখন আমি বললাম, “তোমরা বরং নারায়নবাবুর বাড়িতেই যাও, আমি একবার মনীশের সাথে দেখা করেই আসি । কতদিন ওর সাথে দেখা হইনি ।“
স্পষ্টই বোঝা গেছিলো আমার এই হটকারিতায় ওরা বেশ বিষন্নই হয়েছিলো । ব্যাপারটা আরও বিশ্রী রকম আকার নিলো যখন আমি সন্ধেবেলা ফিরলাম । দেখলাম বরুদা এবং অনিক দুজনেই ভীষন গম্ভীর মুখে এবং চোখ পাকিয়ে কটমট করে আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো । বুঝলাম ব্যাপারটা ভীষন রকম তেঁতে গেছে । আগুনে ঘি টা পড়লো যখন নারায়ণবাবুর বসবার ঘরে বসে আমি বললাম, “এবার তোমরা বলো কতদূর এগোলে ?”
চোখ পাকিয়ে গম্ভীর গলায় রীতিমতো ধমকের সুরে বরুদা বললো, “কতটা এগোলাম মানে ? এটা তোমার আসার সময় হলো অনাদি ? দুপুরবেলা সেই গেলে আর এই সন্ধেবেলা ফিরলে ? তোমার থেকে এরকম হটকারিতা আমি আশা করিনি ।“
“তুমি ছিলেটা কোথায় ? তোমার বন্ধু কি কলেজের দিনের পর থেকে আজ অবধি সব গল্প একেবারেই শুনিয়ে দিলো নাকি ?” অনিক বললো ।
দুমুখো তোপ-গোলায় আমি যখন জর্জরিত প্রায় । ওদের কৌতূহল দুর করতে একটু মৃদ্যু হেসে নিচু গলায় বললাম, “সব জানতে পারবে, সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো এখন বলো নারায়নবাবু কোথায় ?”
“কোথায় মানে ? ও তো থানায় গেলো একবার । কিছু কাজ সেরে এখুনি আসবে সে । আমরা তোমার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছিলাম । ফোনেও তোমাকে পেলাম না । চিন্তায় পড়ে গেছিলাম ।“
“সব কিছু ভেস্তে দিলে তো অনাদি ?”
“কিছু ভেস্তে যায়নি এখনও অনিক । একটু ধৈর্য্য ধরো । বরুদা তোমার গল্পের ক্লাইম্যাক্সে যদি একটু রাত্রিকালীন অ্যাডভেঞ্চারের সংযোজন ঘটে কেমন লাগবে ?”
“মানে, কি বলতে চাইছো একটু খুলে বলো ?'
“তোমাদের সবটা খুলে বলার সময় এখন নেই । তবে আমি ফাঁদ পেতে দিয়েছি বরুদা, তোমাদের গল্পের বাঘ এবার ফাঁদে পড়লো বলে । এখন শুধু গভীর রাতের অপেক্ষা । সবকিছু এখন তোমাদের দুজনের ওপর নির্ভর করছে । যা করার তোমাদেরই করতে হবে ।“
“কিন্তু আমাদের করতে হবেটা কি ? কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না ।“
“নারায়ণবাবু আর তোমরা দুজন শেক্সপিয়র সরণির অরুনলালবাবুদের বাড়ির উল্টো দিকের বিল্ডিং টার ২০৬ নং ঘরটাতে ঘাপটি মেরে বসে থাকবে । আর খেয়াল রাখবে পাশের ২০৫ নং রুমটার ওপর । যা ঘটার ওখানেই ঘটবে । সবকিছু ব্যবস্থা করাই আছে । তোমরা শুধু রুমটার ওপর নজর রাখবে । লক্ষ্য রাখবে বিল্ডিং-এ ঢোকার সময় কেউ যেনো তোমাদের ওপর কোনো সন্দেহ না করে । রাতের অন্ধকারের সাহায্য আমাদের নিতে হবে । ছদ্মবেশের ব্যাপারে দীনু তোমাদের সাহায্য করবে । সেও এখুনি চলে আসবে । মনে রাখবে তোমাদের কাজ হবে ওরা কখন ঘরে ঢুকছে বা ঘর থেকে বের হচ্ছে তার ওপর তীক্ষ্ম নজর রাখা । বাইরের কাওকে যেইনা ওই ঘরে ঢুকতে দেখবে রুম থেকে বেরিয়ে তোমরা নিজেদের মধ্যেই ঝামেলার নাটক শুরু করে দেবে । তোমরা একে অপরকে পুলিশের নামে শাশাবে । সবকিছু হিসাব মতো যেনো হয়- যেইনা দেখবে ওই ঘর থেকে কেউ বা কারা বেরিয়ে আসছে খুব সন্তর্পনে তোমরা তাদের পিছু নেবে । তোমাদের ওপর সমস্ত কিছুটা নির্ভর করছে কিন্তু ।“
দেখলাম বরুদা এবার মুচকি হেসে উঠলো । পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো, “বাহ্! আমাদেরও মাত দিয়ে দিলে অনাদি । কিন্তু এসব করলে কি করে ?”
(১১)
সুভাষিনী দেবীর হাতের অমৃতসম ফ্রায়েড রাইস আর চিলিচিকেন দিয়ে ডিনার সেরে আমরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেলাম । রাত তখন দশটা বেজে পার । ঝুপঝাপ করে দোকানগুলোর ঝাপ পড়তে লাগলো, একটা একটা করে লাইট নিভতে লাগলো । শহরের সোনালী রঙের সৌন্দর্য তখন ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছিলো গভীর রাতের অন্ধকারে । কথামতো অনিক, বরুদা আর নারায়ণ বাবু ছদ্মবেশে বেড়িয়ে যেতেই আমি আর দীনু সোজা চলে গেলাম হ্যাঙ্গের ফোর্ড স্ট্রিটের ধুলোমলিন একটা বাড়িতে । যদিও সেটাকে বাড়ি কম কোনো গোডাউন বলাই চলে । সামনে কয়েক টা দোকান আর তার পিছনে এই বাড়িটি । খুব সন্তর্পনে দুজনে পিছনের পাঁচিল টপকে একটা নির্জন ঘরের মধ্যে গা ঢাকা দিলাম । এবার ছিলো অপেক্ষার পালা । ফিসফিসে গলায় দীনু বললো, “পাশে আরও চারটে রুম আছে । বিশাল ঘরটাতে কোনটাই ও আছে বোঝা মুশকিল ।“
ঠিক তখনই আমি ওর মুখে হাত চেপে ধরে একটা বিশাল ড্রামের আড়ালে লুকিয়ে গেলাম । দেখলাম বারান্দায় একটু আলো জ্বলে উঠলো । তার সাথে কারো চলাফেরা করার আওয়াজ । কিছুক্ষন পর সে আওয়াজ দূরে কোথাও মিলিয়ে গেলো । তারপর আবার সবকিছু চুপচাপ । কোথাও কোনো শব্দ নেই । নিস্তব্ধ কালো রাতে দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁর ডাক আর মাঝেমাঝে মশাদের ডানার শোঁশোঁ শব্দ । এভাবেই কেটে গেলো বেশ কিছুক্ষন । জানিনা আর কতক্ষন এভাবে ওঁত পেতে বসতে হবে । ঘন্টা খানেক কেটে যাওয়ার পরও যখন কিছুই ঘটলোনা দীনু খুবই অধৈর্য্য হয়ে পড়ছিলো । চোখ সওয়া অন্ধকার ঘরের মধ্যে পা টিপে টিপে আমি দরজার কাছে গিয়ে বাইরেটা উঁকি মারলাম । ফিরে এসে দীনুকে বললাম শুধুমাত্র দ্বিতীয় ঘরটাতেই আলো জ্বলছে ।
আরও কিছুক্ষন পর এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে হঠাৎই নিচ থেকে বিকট আওয়াজ করে মেন গেটটা খুলে গেলো । হঠাৎ করেই উত্তেজনায় গা-হাত-পা যেন ঠান্ডা হয়ে উঠলো । পা টিপেটিপে দুজনেই জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরেটায় উঁকি মেরে দেখলাম তিনজন লোক মেন গেট দিয়ে প্রবেশ করে আলো জ্বালানো সেই রুমটার দিকেই যাচ্ছে । এবং দরজা টেনে বন্ধ করার আওয়াজ । সাথে সাথেই বারান্দাতেও আলো জ্বলে উঠলো । কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে দুজনে খুব সন্তর্পনে পা টিপে টিপে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম চারজন লোক- একজন বৃদ্ধ, বেশ গাট্টাগোট্টা দুজন ছোকরা এবং একজন চাদর মুড়ি দেওয়া লোক একটা টেবিলের চারদিক ঘিরে রয়েছে । আর টেবিলের মাঝখানে সেই বাক্সটা ।
পিছন থেকে আরও কয়েকটা পায়ের শব্দ । ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে বরুদা, অনিক ও নারায়নবাবুকেও অন্য জানালাটার দিকে যেতে ইঙ্গিত করলাম । এবার দেখলাম চাদর মুড়ি দেওয়া লোকটা পকেট থেকে একটা লকেট বের করে বৃদ্ধটার হাতে দিলো । বৃদ্ধটা মুখ দিয়ে একটা বিশ্রী হুঙ্কার দিয়ে উঠলো । তারপর পাগলের মতো কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্সটা তুলে নিয়ে চুমু খেতে লাগলো । স্বর্ণতারকাটা লকেট থেকে বের করে বাক্সটার এদিক ওদিক হাতরে হাতরে সেটাকে লাগানোর চেষ্টা করলো । আমি আস্তে করে দরজার ছিটকিনিটা টেনে দিলাম । বাক্সটা খোলার কোনো উপায় না পেয়ে বৃদ্ধটা পশুর মতো এক হুঙ্কার ছাড়লো, “অ্যাঁ... এটা খুলবো কিভাবে ? হাতুড়ি...”
আমি সবাইকে একটা করে মাস্ক দিয়ে নিজেও একটা পড়ে নিলাম । দেখলাম বৃদ্ধ একটা হাতুড়ি নিয়ে বাক্সটার ওপর আঘাত করতে লাগলো । একবার...দুবার...তিনবার । আর সঙ্গে সঙ্গেই চাপা একটা শব্দ ও মৃদ্যু অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সাথে সারা ঘর ধোঁয়াতে ভরে গেলো । সকলে এক সাথে দরজার দিকে ছুটে এলো । কিন্তু দরজা খোলা না পেয়ে পাগলের মতো এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে লাগলো । খানিকক্ষণ এমন হওয়ার পর ছিটকিনিটা খুলে দিতেই চারজনে হুমড়ি খেয়ে বাইরে এসে একে অপরের ঘাড়ে এসে পড়লো । তারপর চারজনে চারজনকে জাপটে ধরে টানতে টানতে বাইরে আনলাম । ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলো । সাথেসাথেই পুলিশের জিপ এসে গেলো ।
“সারপ্রাইজ...। সারপ্রাইজ মি.মাহাতো । আর ইউ সারপ্রাইজড মি.প্রকাশলাল সান্যাল ? আর এই দুই বাছাধনের কি যেনো নাম ?
“কালু আর বুলু ।“ বললো দীনু ।
“হ্যাঁ, বড্ড উড়ছিলে তোমরা বাছাধন । পরিচয় করিয়ে দিই ? নারায়ণ বাবু আপনার ফাঁদের বাঘ মি.আশিষ মাহাতো কে তো চিনতেই পারছেন আর এই দুজন কালু আর বুলু । এই তল্লাটে যত দুনম্বরি কাজ চলে তার প্রায় পুরোটাই এদের হাত দিয়ে । সম্প্রতি কলকাতা শহরে যে অগ্নিকান্ডগুলো ঘটছে । তার সাথেও এদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে । এর পরের সমস্ত ঘটনা আপনি পরে দীনুর কাছ থেকেই শুনে নেবেন । এদের বিরুদ্ধে সমস্ত প্রমাণ দীনুর কাছেই পেয়ে যাবেন । এ ব্যাপারে দীনুর প্রশংসা করতেই হয় । আপনি শুধু ওর পারিশ্রমিকের দিকটা একটু লক্ষ্য রাখবেন ।“
পুলিশের জিপে বসে তিনজনেই আমাকে হিংস্র জন্তুর মতো দৃষ্টি দিয়ে বিধছিলো । প্রকাশবাবু লজ্জায় মাথা নিচু করে ঠায় দাড়িয়ে রইলেন । কিছুক্ষন পর আরো একটা গাড়ি এসে থামলো । গাড়ি থেকে নেমে এলেন স্বয়ং অরুনলালবাবু ও তাঁর আরও দুই ছেলে । অরুনলাবাবুকে দেখে এবার আশিষ মাহাতো যেনো তেলেবেগুনে জ্বলতে উঠলো । ক্রোধে চোখমুখ ফুলিয়ে সে গর্জন করলো, “তুই...আবার আমার কাজে বাধা দিলি ?”
“বাধা ? যা করার আপনি তো করেই ফেলেছেন ।“ বরুদা বললো ।
বাক্সটার শেষ পরিণতি দেখে আরুনবাবু ভীষণভাবে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন । প্রকাশ বাবুকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, “ছি ! শেষে তুই এ কাজ করলি ?”
এবার অনিক আমার পাশে এসে কাঁধে হাত রাখলো, অন্যপাশে বরুদা ।
