স্বর্ণতারকা রহস্য
_রাজেশ মল্লিক,২৮/০৩
দ্বিতীয় পর্ব
বরুদার কথায় নারায়ণবাবু অরুনলাল সান্যালের বড় ছেলে মোহন সান্যালকে ফোন করে জানতে চাইলেন অরুণবাবু ও ওনার স্ত্রী এবং চাকর রামু কেমন আছেন | তাঁরা এখন কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় আছেন কিনা | উত্তরে তারা জানায় ডাক্তার বাবু এসেছিলেন, এখন বিশ্রামের কথা বলেছেন | রাতের ধকলে আর আতঙ্কে সবাই ভেঙে পড়েছেন | তাই আমরা যদি বিকাল বেলার দিকে যাই তাহলে ভালো হয় |
এই কথা শুনে বরুদা পরামর্শ দেয় কয়েকজন ছদ্মবেশী পুলিশ কর্মীকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাড়িটির উপর কড়া নজর রাখতে | যথারীতি হাতে অনেকটা সময় পাওয়া গেলো |
থানা থেকে নারায়ণ বাবুর বাড়ি বেশি দূরে নয় | কলকাতায় ট্রান্সফার হয়ে আসার পর থানা লাগোয়া শেক্সপিয়র সরণি থেকে সামান্য দূরেই একটি বাড়িতে থাকেন | কাজেই প্রতিপত্তিশালী এবং নামজাদা বৃদ্ধ অরুন বাবুর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বেশ ভালোই | নারায়ণ বাবু এবং তাঁর স্ত্রী সুভাষিণী দেবী যে বাড়িতে থাকেন তা খুব বেশি বড় না হলেও দুজন মানুষের পক্ষে তা যথেষ্টই | নারায়ণ বাবুর পুলিশি জিপে করে তাঁর বাড়িতে পৌঁছাতে লাগলো মাত্র কয়েক মিনিট | গেট খুলে সুভাষিণী দেবী আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন | মিষ্টি হাসি ও তাঁর সৌন্দর্যে যেন প্রাণটা জুড়িয়ে যায় | নারায়ণ বাবুর বাড়িতে পৌঁছে আমরা ফ্রেশ হলাম, তারপর বসবার ঘরে মুখোমুখি বসে চললো কথাবার্তা | কথায় কথায় বরুদার মুখে চলছিল আমাদের ভূয়সী প্রশংসা |
“জানো নারায়ণ, ছেলে দুটোর রহস্যের প্রতি টান আমাকে খুবই মুগ্ধ করে । দুটো যুবকের একজন বয়স্ক মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আমাকে বারবার টেনে নিয়ে যায় ওদের আস্তানায় |”
লজ্জায় আমাদের মুখ লাল হয়ে গেলো, অনিকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মাথা নিচু করে মুচকে হাসছে | আমি লাজুক চোখেই বরুদার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, "কেন লজ্জা দাও বরুদা, “তুমিও যে আমাদের খুবই প্রিয় | শ্রদ্ধেয় তো বটেই এবং খুবই আপন |"
আমার সাথে অনিকও যোগ দিলো, "তোমার সঙ্গ আমরাও কি কম উপভোগ করি বরুদা |"
বরুদা হেসে উঠে বললো, “বেশ ! বেশ !”
হাসি ও ঠাট্টার পরক্ষনেই আবার সিরিয়াস হয়ে যাওয়াটা হয়তো পুলিশি জীবনের একটা বড় বৈশিষ্ট্য, হয়তো দায়িত্ববোধ থেকেই সেটা আসে |
নারায়ণ বাবু ফ্যাকাসে মুখে বরুদাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “কেসটা নিয়ে আপনি কি ভাবছেন ,ব্যানার্জী বাবু ?”
“কেসটা কিন্তু আর পাঁচটা কেসের মতোই সাধারন, এমন ঘটনাতো ঘটেই থাকে- কিন্তু, তোমাকে এত বেশি চিন্তিত কেন লাগছে ।“
“আসলে, জানেনই তো কোলকাতায় আজকাল কিসব ঘটছে । তাই কদিন আগেই উপর মহল থেকে চিঠি পেয়েছি এলাকাগুলোর কড়া নিরাপত্তার জন্য । আর তারপরেই এই ঘটনা- খুবই চাপে আছি । টেনসনে আমার সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে । আপনি স্বয়ং ফোন করতে তো আমি চাঁদ হাতে পেলাম স্যার ।“
“বুঝলাম ।“
“আপনি এ যাত্রায় আমাকে উদ্ধার করুণ স্যার ।“
“এসব ‘স্যার, আপনি' আর শুনবো না | দেখছো না অনাদি আর অনিকের মতো বাচ্ছারা আমাকে বরুদা বলছে, তুমি বলছে -এই অভ্যাসটা তুমিও আনো নারায়ণ |”
“আচ্ছা চেষ্টা করবো ।“
“বেশ, সে কথা থাক | কয়েকটা জিনিস তুমি আমায় বলো যে, অরুনলাল বাবুর ছেলেরা কি কি করে, কেমন মানুষ তারা ? তুমি তো ওদের কাছ থেকে দেখেছো | তাঁর আরেকটি ছেলে কলকাতায় থাকেনা কেন ?”
নারায়ণ বাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তখনি, সুভাষিণী দেবী লাঞ্চ রেডি আছে বলে গেলেন |
“আচ্ছা আপনারা আসুন-ইয়ে-মানে -আসো । আগে লাঞ্চটা সেরে নেওয়া যাক, তারপর আলোচনা হবে |” নারায়ণ বাবু বললেন |
লাঞ্চ টেবিলে বেশি কথা হলনা | সত্যি সুভাষিণী দেবীর হাতের রান্নার জবাব নেই | আয়েশ করে অতিথি আপ্যায়নের আনন্দ নিয়ে বরুদাকে ভীষণ খুশি মনে হলো - আমরাও যে খুবই খুশি ছিলাম তা বলাই বাহুল্য | লাঞ্চ শেষ করে আমরা বসলাম ব্যালকনিতে | নারায়ণ বাবুই প্রথম কথা বললেন, “অরুনলাল বাবু অমায়িক লোক | বড়ছেলে মোহনলাল ও ছোট ছেলে প্রকাশলাল পারিবারিক ব্যবসা সামলাতে কলকাতাতেই থাকেন | মেজো ছেলে লালকমল থাকেন দেশের বাড়িতেই | যদিও মাঝে মধ্যেই যাতায়াত করেন | নদিয়ার কোনো এক কলেজের প্রফেসর উনি |”
“আচ্ছা বেশ, তাহলে তুমি কয়েকটা কাজ করো নারায়ণ, পলাশী থানা থেকে একবার খোঁজ নাও যে, লালকমল এখন কোথায় আছে ? পারলে বিশ বছর আগের ফাইল খুলে দেখতে বলো যে অরুনলাল সান্যাল বাবুর পরিবার কেন্দ্রিক কোনো ঘটনা সেখানে আছে কিনা- আমার বিশ্বাস এমন কিছু ঘটনা অবশ্যই রয়েছে | আর যে পুলিশ কর্মচারীদের তুমি পাঠিয়েছো অরুনলালের বাড়ি নজর রাখতে, খোঁজ নাও কোনো বিশেষ কিছু তারা দেখতে পেলো কিনা সাথে এটাও বলে দিয়ো আশেপাশের সমস্ত বাড়ি গুলোর দিকেও কড়া নজর দিতে- তাড়াতাড়ি এই কাজগুলো করে ফেলো |”
আমার মাথায় তক্ষুনি একটা বিদ্যুৎ খেলে গেলো | বরুদার ইশারায় হঠাৎ করে রহস্যের একটা চাবি হাতে পেয়েছি মনে হলো, সমস্ত ঘটনাটা এক সুতোয় এবার গাঁথা যাচ্ছে | আমার আর বরুদার ভাবনা যে একই কথা বলছে তা বেশ পরিষ্কার |
নারায়ণ বাবু উঠে গিয়ে পাশের ঘরে ফোন করতে গেলেন | অনেকক্ষন পর আমরা তিনজন আবার একসাথে হলাম | অনিক বরুদাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলো, “তুমি কি পরিবারের কাউকেই সন্দেহ করছো ?”
“হ্যাঁ, সেটা ভাবার অনেক কারণও তো রয়েছে, তবে স্পটে যেতে পারলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে |”
“তাহলে তো বৃদ্ধা-বৃদ্ধার কোনো বিপদও তো হয়ে যেতে পারে !”
আমি বললাম, "না অনিক আমরা না যাওয়া অবধি কোনো বিপদ আসবে বলে তো মনে হয়না, কারণ বিকাল অবধি ওনারাই সময় চেয়েছেন | সমস্ত কিছু যখন পরিকল্পনা মাফিকই চলছে তখন, আলটপকা কিছুই করবে না- অন্তত আমার তো তাই বিশ্বাস | আর কিই বা করবে ? বড্ড জোর প্রমাণ লোপাট ছাড়া । আর দুষ্কৃতি চাইলে কালকেই খুন করতে পারতো, কিন্তু সে যদি অন্য কিছুই চায়..."
"বেশ অনেক দূর অবধি অনুমান করেছো অনাদি; তা আর কি কি মনে হয় তোমার ?" বরুদা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো |
তারপর আমি আবার বলতে লাগলাম :
“বরুদা, এই ব্যাপারে আমার সন্দেহই নেই যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিবারের কেউ এতে জড়িত রয়েছে বরং আমি ভাবছি যে অপরাধের মোটিভ টা কি ? পলাশী এবং কোলকাতা- ওদের দুটো বাড়িতেই একই ঘটনা- এটা কি নিছকই কাকতালীয় ? দুটো চুরির ঘটনা যদি আমরা এক সুতোয় বাঁধতে চাই তাহলে এটা দেখবো যে, সপ্তাহ খানেক আগে পলাশীতে তাঁদের বাড়িতেই চোর চুরি করতে এলো অথচ কিছু চুরি না করেই চলে গেল; দ্বিতীয় চুরির ঘটনায় দেখা গেলো চোর সামান্য কিছু টাকার জন্য এতো দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর কসরত কেন করলো যেখানে সামান্য পরিশ্রমেই কাজটা হতে পারতো | আমার দৃঢ় বিশ্বাস চোর স্থির উদ্দেশ্য নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু জিনিস খুঁজতেই এসেছিলো । কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেটা না পেয়ে সোফা ও খাটের গদি ছিঁড়েছে | সুতরাং, কিছু একটা জিনিস তো আছেই যেটা এই পরিবার লুকিয়ে রেখেছে অপরাধীর থেকে | তবে প্রিঅ্যাসাম্পশন বা পূর্বানুমান যে সবসময় সম্পূর্ণ সঠিক হবে এমনটা নয় । যেখানে আমরা তাদের ব্যাপারে কিছু তথ্য ছাড়া আর কিছুই জানিনা । তবে পুরো ঘটনা দিয়ে সম্পূর্ণ মালা গাঁথতে খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে পলাশী থানার তথ্য গুলো- তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলেই মনে হয় তবে আমি যা আঁচ করছি-তা-হলে আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একবার অরুনলাল বাবুর সাথে দেখা করা দরকার- আর তার আগেও চাকর রামুর মুখ থেকে ঘটনার ব্যাপারে কিছু জানতে পারলে কিছু ক্লু আমরা পেতে পারি বলে মনে হয় |”
খানিক পর নারায়ণ বাবু যে খবর গুলি নিয়ে এলেন তা ছিল এইরকম- লালকমল বাবু এখন পলাশীতে নেই, বাবা-মায়ের উপর এরকম হামলার কথা শুনে থাকতে না পেরে ঘন্টা খানেক আগেই কলকাতা রওনা হয়েছেন | অন্যদিকে, বিশ বছর আগে পলাশীতে একজন গবেষকের খুনের মামলায় নাম জড়ায় অরুনলাল বাবুর, তিনি ওই খুনের প্রত্যক্ষদর্শী এবং একমাত্র সাক্ষী ছিলেন | তাঁর সাক্ষীর ভিত্তিতেই গবেষক প্রফেসর আর.কে. দাসের হত্যা এবং গবেষণা সংক্রান্ত পুঁথি চুরির অপরাধে তাঁর সহকারী আশীষ মাহাতোর বিশ বছরের জেল হয় | জানা যায় তাঁরা বাংলার নবাবী আমলের গুপ্তধন সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা করছিলেন | সম্প্রতি আশীষ মাহাতো জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন |
ব্যাস, এই তথ্য আমাদের তদন্তকে আরো এক নতুন দিক দিলো- তবে আমাদের অনুমানকে আরো বল প্রদান করলো | নারায়ণ বাবু সহ আমাদের চার জনের কাছেই ব্যাপারটা এতক্ষনে কিছুটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো | কয়েক মুহুর্তের জন্য প্রত্যেকে প্রত্যেকের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে, চারজনেই উঠে পড়লাম -
নারায়ণ বাবুর জিপে করে তড়িঘড়ি আমরা সোজা হাজির হলাম অরুনলাল বাবুর বিশাল বাড়ির সামনে | দুই প্রান্তে ছোট ছোট দুটো ফুলের বাগান আর মাঝদিয়ে চওড়া রাস্তা | দরজার মাথায় চোখে পড়লো ভাঙা সিসিটিভি ক্যামেরার অবশিষ্টাংশ । ঘরে প্রবেশ করতেই দেখলাম দুই দম্পতি যুগল যে যার রুম থেকে বেরিয়ে এলেন | নারায়ণ বাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন | মোহনলাল বাবু বললেন, "বাবা-মা দোতলার ঘরে আছেন |"
সিঁড়ি দিয়ে উঠে উপরে যাওয়ার সময় নারায়ণ বাবু একটু থমকে বললেন, "রামুকে একবার উপরে পাঠিয়ে দিয়ো তো .."
রুমে প্রবেশ করে দেখলাম বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন | দুজনারই হাতে ও মুখে স্পষ্ট লাল দাগ | নারায়ণ বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, "এখন কেমন আছেন অরুনলাল বাবু , মৃনালী দেবী ?"
বৃদ্ধ দম্পতি একসুরে উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ,ভালো, ভালো | এখন বেশ ঠিক আছি ।“
বরুদা পাশ থেকে একটি চেয়ার টেনে নিয়ে অরুনলাল বাবুর পাশে বসে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো :
“মিস্টার সান্যাল আপনি মনে করে বলুন, কাল আপনি ঠিক কি কি দেখেছেন ?”
বৃদ্ধ কম্পিত গলায় বলতে শুরু করলেন :
“রাতে খাবার পর রামু ওষুধ দিয়ে গেলো, দুই বুড়ো-বুড়িতে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে গেছিলাম | ওর গোঙানিতে ঘুম ভাঙলো, উঠতে গিয়ে বুঝতে পারলাম- হাতদুটো শক্ত করে খাটের সাথে বাঁধা; অন্ধকার ভেদ করে একটা তীক্ষ্ণ টর্চের আলো এসে পড়লো আমার চোখে | কিছু বুঝে ওঠার আগে লোকটা পশুর মতো গায়ের জোড়ে আমারও মুখটা বেঁধে দিলো ।“
তারপর বৃদ্ধা ভাঙা গলায় বললেন, "অন্ধকারে বোঝার উপায় ছিলোনা তবে ঠাওর করতে পারছিলাম লোকটা আলমারির কাছে গিয়ে কাগজপত্র সব ফেলফেলি শুরু করলো, তারপর খানিকক্ষণ এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে সবকিছু তছনছ করে চলে গেলো ।
“আচ্ছা বেশ । লোকটকে দেখতে কেমন ?”
“বেশ মোটাসোটা, ভীষন শক্তিশালী । কালো মুখোশ পড়েছিলো ।“
এমন সময় হাতে সরবতের ট্রে নিয়ে রামু প্রবেশ করলো | তাকে জিজ্ঞাসা করতে সে বললো,
"বাবু আর মাকে ওষুধ দিয়ে নিচে নেমে গেট টা লাগিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, ভাবলুম দাদাবাবুরা এই ফিরবেন হয়তো- তখনি বাইরে থেকে পায়ের আওয়াজ পাই, দরজা খুলে কাওকে দেখতে না পেয়ে বাগানের চারিদিকে বার কয়েক টর্চের আলো মেরে ফিরে এসে দরজা দিতে যাবো- সেই সময় দেখি একটা লোক সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে যাচ্ছে- ‘কে রে ওখানে ' বলে যেই না কাছে গেছি অমনি লোকটা আমার উপর চড়াও হলো | ধস্তাধস্তির সময় লোকটা টর্চের পিছন দিয়ে সজোড়ে মাথায় আঘাত করলো- তারপর আমার কিছু মনে নেই | স্যার, জ্ঞান হারানোর আগে লোকটার গলা থেকে আমি কি পেয়েছি দেখুন ..."
এই বলে রামু লকেট সমেত একটা হার বরুদার হাতে দিয়ে বললো, "জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ার আগে এটা আমার হাত থেকে পড়ে ছিটকে পাশে আমার ঘরেই ঢুকে যায়, সকালে আমি এটা পাই |”
“এটা তুমি আর কাওকে দেখিয়েছিলে |”
“না স্যার, ভেবেছিলাম দাদাবাবুদের দেখাই কিন্তু আর দেখানো হয়নি |”
“বেশ করেছো, আর কাওকে বলারও প্রয়োজন নেই, এখন তুমি যাও |”
একে একে লকেটটা সবাই হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো প্রথমে নারায়ণ বাবু পরে অনিক তারপর আমার হাতে; বরুদার ইশারায় আমি লকেটটা হাতের মুঠোয় নিয়ে অরুনলাল বাবুর উদ্দেশ্যে বললাম, "অরুনলাল বাবু আপনি কি শুনেছেন আশীষ মাহাতো সম্প্রতি ছাড়া পেয়েছে ?"
আশীষ মাহাতোর নাম শুনে অরুনলাল বাবুর মুখটা লাল হয়ে গেলো | রাগে আর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘লম্পট, দুশ্চরিত্র, খুনি’ এই তিনটি শব্দ স্পষ্ট বোঝা গেলো |
তারপর আমি আবার বললাম, "পলাশীতে আপনার সাক্ষীর ভিত্তিতে প্রফেসর আর.কে.দাসের হত্যার অপরাধে আশীষ মাহাতোর কুড়ি বছরের জেল হয় | হতে পারে কুড়ি বছর আগের সেই বদলা নিতে চায় সে | তবে আমাদের বিশ্বাস এমন কিছু ব্যাপার অবশ্যই রয়েছে যার জন্য সে ব্যাকুল | প্রতিশোধ স্পৃহা । আপনি আমাকে বলুন তো ঠিক কি কারণে মি.মাহাতো প্রফেসর দাসকে খুন করেছিলো ? কোনো কথা লুকাবেন না | এতে আপনার ও আপনার পরিবারের সমূহ বিপদ হতে পারে |”
বৃদ্ধ তখন বার কয়েক মৃনালী দেবীর দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন-
"প্রফেসর আর.কে.দাস বাংলার নবাবী আমলের গুপ্তধন বিষয়ক গবেষণা করছিলেন | তাঁর মতে তিনি এমন কিছু গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছিলেন যা নাকি বাংলার ইতিহাসকে বদলে দিতে পারে | তাঁর মতে, সুবে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রাজকোষ থেকে কৃষ্ণদাস বল্লব বিপুল পরিমান অর্থ ও সোনা-রুপা আত্মসাত করে কলকাতায় ইংরেজদের শরণাপন্ন হওয়ার আগে নদিয়ার পলাশীর কোনো এক অঞ্চলে ছদ্মবেশে ক্ষনিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁর ধারণা হয়েছিল এতো বিশাল ধনরাশি নিয়ে ইংরেজদের শরণাপন্ন হওয়া ঠিক হবেনা তাই কিছু পরিমান ধন সম্পদ তাঁর যাত্রাপথেই কোথাও লুকিয়ে দেন | প্রফেসর দাসের বিশ্বাস হয়েছিল সেই লুকানো ধনসম্পদের সন্ধান তিনি পেতে পারেন | এই মতবাদটি তিনি খুব শিঘ্রই সবার সামনে আনতে চলেছিলেন ।
গবেষণার সুবিদার্থে তিনি একটি দল গঠন করেন, আমি এবং মাহাতো সেই দলেরই সদস্য ছিলাম | তিনি আমাদের সবাইকে আলাদা আলাদা কাজে নিযুক্ত করেছিলেন | প্রফেসর দাস তাঁর গবেষণা মূলক সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একটি ডাইরিতে লিখে রাখতেন আর কাগজপত্র সব সময় নিজের কাছেই রাখতেন | শেষের কয়েকদিন তাঁর ধারণা হয়েছিল কেউ বা কারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে | একদিন তিনি তাঁর গবেষণার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুঁথি ও ডাইরি একটি বাক্সের ভিতর পুরে নিয়ে আমার কাছে এলেন, “আমাকে বাক্সটা দিয়ে বলেন এটা লুকিয়ে রাখতে | বাক্সটার বিশেষত্ব ছিল একটা নির্দিষ্ট উপায় ছাড়া এটা খোলার বা ভাঙার চেষ্টা করলে ভিতরে রাখা পুঁথি ও ডাইরি নষ্ট হয়ে যাবে | উপায়টা তিনি আমাকেও বলেননি | তারপর একদিন প্রফেসর দাসের ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখি উনি মেঝেতে পড়ে রয়েছেন, মাথা থেকে রক্ত ঝরে বয়ে যাচ্ছে মেঝেতে- খানিক দূরে এক হাতে কিছু ফাইল অন্য হাতে একটা লোহার রড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাহাতো | সেই পশুর মতো মূর্তি আর ওর শয়তানি হাসিটা এখনো ভাবলে রক্ত হিম হয়ে আসে |”
দেখলাম অতীতচারণের পর ভদ্রলোকের মুখ আতংকে ও রাগে লাল হয়ে গেছে | উত্তেজিত যে আমরাও হয়ে পড়েছিলাম তা বলাই বাহুল্য | অনিক উত্তেজিত কণ্ঠে তাঁকে প্রশ্ন করলো, “সেই বাক্সটা এখন কোথায় ?"
বরুদা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন- "বাক্সটা নিশ্চয় এখনো আপনার সাথেই আছে ?"
ভদ্রলোক খানিকক্ষণ নির্বাক থেকে উত্তর দিলেন- "হ্যাঁ |"
"সেটা কি দেখা যায় ?" বরুদা বললো |
"বাক্সটার কথা এর আগে আমি কাওকে বলিনি, আমার ছেলেদেরও এ বিষয়ে কিছুই জানাইনি- এমনকি বিশ বছর আগে পুলিশি জবানবন্দিতেও আমি এর উল্লেখ করিনি | ভয় হতো এই বাক্সতে রক্ষিত গোপনীয়তা যদি ফাঁস হয় না- জানি এর পিছনে আবার কত লোকের লোলুপ দৃষ্টি পড়বে | কাউকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলামনা । দীর্ঘ বিশটা বছর বুকে আগলে রেখেছি প্রফেসর রাধানাথ কুমার দাসের আমানত | সেটা যেখানেই আছে সুরক্ষিত আছে আর আগামীতেও থাকবে | আপনাদের কাছে অনুরোধ দয়া করে আপনারাও এর গোপনীয়তা রক্ষা করবেন |"
"আপনার কি এখনো মনে হয় যে এর গোপনীয়তা রক্ষিত আছে ? কেউ বা কারা এর বিষয়ে যে অবগত রয়েছে সে তো বুঝতেই পারছেন | আপনি এবং আপনার পরিবার এখন বিপদের মধ্যে রয়েছেন সান্যাল বাবু | এখনো হাতে সময় আছে বাক্সটা আমাদের দেখালে আমরা কোনো একটা উপায় নিশ্চয় বের করতে পারবো |"
বৃদ্ধ অরুনলাল বাবুকে ভাঙা খুবই কঠিন কাজ ছিল তবে অভিজ্ঞ বরুদা ও নারায়ণ বাবুর দৌলতে এবং মৃনালী দেবীর কথায় শেষমেশ তিনি রাজি হলেন | তবে সে ক্ষেত্রে আমাদের কথা দিতে হলো যে এর কথা আমরা কাওকেই জানাবো না এবং আমরা এই বাক্সের সাধ্যমত রক্ষা করবো |
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে ভদ্রলোক টেবিল থেকে চশমাটা তুলে নাকের ডগায় বসিয়ে ধীর পদক্ষেপে খাটের উল্টো দিকের দেয়ালের চারটি ছবির মধ্যে একটি বিশেষ ছবির ফ্রেমের সামনে দাঁড়ালেন, কৌতুহলী উত্তেজনায় তখন আমাদের সকলের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে- ঠিক তখনি অরুনলাল বাবু এক অদ্ভুত কায়দায় সেই ছবির ওপর চাপ দিয়ে ফ্রেমটা চারবার ক্লকওয়াইস ঘুরিয়ে পুনরায় আগের অবস্থানে নিয়ে এলেন তারপর আবার তিনি খাটের পাশে ফিরে এসে আরও এক অদ্ভুত কাজ করলেন- খাটের মাথার দিকের দেয়ালের একটি বিশেষ অংশে দেখলাম একটা ছোট্ট হুকে চাঁদমালা ঝুলছিলো- তিনি সেই হুকটা ধরে উপরের দিকে চাপ দিলেন এবং সাথে সাথেই নিঃশব্দে খাটের মাথার দিকের দেয়ালের একটি বিশেষ অংশ থেকে একটা স্লাইড খুলে গেলো | স্লাইড খুলতেই একটি ছোট কুঠুরিতে ভদ্রলোক তাঁর হাত ঢুকিয়ে বের করলেন সম্পূর্ণ ধাতব মোড়কে মোড়া একটি বাক্স | এই অভাবনীয় ও অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আমরা কিঞ্চিৎ হতভম্ব হয়ে একে ওপরের মুখের দিকে তাকালাম |
খুব সাবধানে ভদ্রলোক বাক্সটা খাটের ওপর রাখলেন তারপর আমরা সকলে সেটাকে ঘিরে আশ্চর্য ও স্তম্ভিত হয়ে দেখতে লাগলাম | বাক্সটা সম্পূর্ণ সোনালী রঙের ধাতব আস্তরণে ঢাকা থাকায় বাক্সটা খোলার কোনো উপায় বোঝা গেলোনা | ভিতরে রক্ষিত কাগজপত্র ও ডাইরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে বেশি নাড়াচাড়া করার সাহসও হলোনা |
অনিক বললো, "সত্যিই অদ্ভুত বাক্স ।“
নারায়ণ বাবু বললেন, “প্রফেসর দাসের প্রশংসা না করে পারছিনা |"
বরুদা বন্ধ দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললো, “প্রশংসা তো অরুনলাল বাবুরও প্রাপ্য যেভাবে তিনি এটাকে বিশ বছর ধরে সযত্নে রক্ষা করছেন |"
এতক্ষনে অরুনলাল বাবু আমাদের উদ্দেশ্যে কিছুটা নরম গলায় বললেন, “কৌতূহল আমারও যে হয়নি তা নয়, তবে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ- প্রাণ থাকতে প্রফেসর দাসের আমানত নষ্ট বা বেহাত হতে আমি দেবোনা |"
"কিন্তু সান্যাল বাবু এই বাক্সটার রহস্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমাধান করা দরকার এর পিছনে কিন্তু লোক পড়েছে | আপনি কি জানেন আপনার...|" আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখলাম বরুদা গুটিগুটি পায়ে দরজার দিকে যাচ্ছে আমিও সাথে সাথেই কিছু একটা আঁচ করে দরজার কাছে গিয়ে দেখলাম দরজার খানিকটা অংশ খোলা রয়েছে, দরজা খুলে দরজার ওপারে দেখি একজোড়া পায়ের ছাপ | তক্ষুনি আবার অরুনলাল বাবুর কাছে এসে আমাদের বলতেই হলো :
“এবার তো বাক্সটা এখানেও সুরক্ষিত নয়, ভেবেছিলাম এখন বলবোনা কিন্তু আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনার পরিবারের কোনো এক বা একাধিক সদস্য এই বাক্স হাতানোর চক্রান্তে জড়িত আছে বলেই আমরা সন্দেহ করছি | দরজার আড়াল থেকে আড়িপেতে কেউ সব শুনছিলো | এখন যদি এই বাক্স সুরক্ষিত রাখতে চান নারায়ণ বাবুর হাতে সোপর্দ করে দিন নয়তো কিছু একটা ঘটে যেতে পারে |"
পরিবারের সদস্য জড়িত থাকতেও পারে এটা হয়তো তিনি ভাবতেও পারেননি, তাই এই সন্দেহের কথা শুনে ভদ্রলোক খানিকটা মুষরে পড়লেন |নারায়ণ বাবু তাঁকে ও মৃনালী দেবীকে সান্তনা দিলেন |
যখন ভদ্রলোক বাক্সটা নারায়ণ বাবুর হাতে দিলেন তখন দেখলাম তাঁর চোখের কোণে কয়েক বিন্দু জল; তারপর হঠাৎ করে তিনি উত্তেজিত হয়ে যা বললেন তা শুনে আমরা কিছুটা অবাক হলাম |
“এই বাক্সর, রহস্য তোমাদের উদ্ধার করতেই হবে নারায়ণ | যা মনে হয় এখন আর এটা লুকিয়ে রাখা ঠিক হবেনা বরং এর পিছনে যাদের শকুনের মতো লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে তাদের সবাইকেই ধরা দরকার |”
একটা বড় ব্যাগের ভিতর বাক্সটা পুড়ে নিয়ে খুব সাবধানে সবার চোখ এড়িয়ে নারায়ণ বাবু গাড়িতে উঠলেন এবং আমরা পিছন পিছন গিয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি ঠিক তখনি প্রকাশ বাবু পিছন থেকে হাঁক ছাড়লেন এবং কাছে এসে বললেন, "কি মশাই আপনারা চললেন নাকি ?”
“হ্যাঁ, জরুরি কিছু কাজ আছে |”
“আরেকটু অপেক্ষা করতে পারতেন মেজদা আসছে |”
“আচ্ছা কাল সকালে আসা যাবে তবে | আর হ্যাঁ রাতের বেলাটা একটু সাবধানে থাকুন, বাকি কাল কথা হবে ।“
বেলা পরে তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে, চারিদিকে হালকা অন্ধকার, লাইট পোস্টের হালকা হলুদ আলোতে শহরটা হঠাৎ করেই রং পাল্টালো |
অরুনলাল বাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছু আসতেই দেখলাম একটা হলুদ ট্যাক্সি অরুনলাল বাবুর বাড়িতে ঢুকলো, অনিক আমার কানের কাছে মুখ এনে বললো, "লালকমল বাবু মনে হয় |"
আমি ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম, "হুমম..."