স্বর্ণতারকা রহস্য
রাজেশ মল্লিক,১৮/০৩
গোয়েন্দাগিরি যে কিভাবে আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে উঠলো তার সূত্রপাত ঘটেছিলো এই ঘটনার মধ্যে দিয়েই | আমরা অর্থাৎ আমি অনাদি রায়, আমার বন্ধু অনিক সেন এবং বরুদা ওরফে বরুনবিহারী ব্যানার্জী | আমি তখনো কোনো চাকরি করিনা সামান্য একজন টিউশন টিচার । সকাল-সন্ধ্যা ছেলে পড়িয়ে দিব্বি কেটে যেত আর বাকি দিনটা বইয়ে মুখ গুঁজে | তবে শনি-রবিবার ছুটির দিনগুলো হতো কিছুটা অন্যরকম- অনিক ও বরুদার সাথে সারাদিন চলতো জমিয়ে আড্ডা ও খাওয়া-দাওয়া; আবার কখনো বেরিয়ে পড়তাম তিনজনে- যেদিকে চোখ যেত | অনিক এক সরকারি দপ্তরে চাকরি করে, সপ্তাহে পাঁচদিন ডিউটি আর বাকি দুদিন চলে আসতো আমাদের আস্তানায় | বরুদা একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ইন্সপেক্টর | তিনি বলেন, "তোমাদের সঙ্গ আমাকে আমার যুবক বেলার কথা মনে করায়, তাইতো সুযোগ পেলেই চলে আসি |" সত্যি বলতে কি লোকটার বয়স ষাটোর্ধ হলেও আমাদের তাঁর সঙ্গ বেশ উপভোগ্যই লাগতো | হালকা রসিকতা আর তার সাথে তাঁর পুলিশ জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, তিনি যেমন গল্পচ্ছলে বলতেন আমরাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম | হয়তো ওনারই দৌলতে আর ডিটেক্টিভ বইয়ে মুখ গুঁজে পরবর্তীকালে আমাদের মনেও ডিটেক্টিভিটি নিয়ে মাথা ঘামানোর আগ্রহ জাগে |
সেদিন শনিবার | জানালার পাশে বসে মুষলধারে বৃষ্টির খেলা দেখছিলাম আর বৃষ্টির ছিটে-ফোটা গায়ে মাখছিলাম | রাস্তার ওপারের বাঁশবন ঝড়ের ধাক্কায় বারবার এক ছন্দে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো পিচের রাস্তাটা | আমি হারিয়ে গেছি সকালের বৃষ্টি-সিক্ত প্রকৃতির সম্মোহনী শক্তিতে |
আর তখনি আমার মনোযোগ ভেঙে গেলো মোবাইলের বেমানান আওয়াজে | যাই হোক, উঠে গিয়ে ফোনটা তুললাম | ওপার থেকে পরিচিত কণ্ঠে অনিক বললো, "কি বৎস! বৃষ্টির মূর্ছনায় হারিয়ে গেছো বুঝি |"
আমি হেসে বললাম, "হ্যাঁ,বলতে পারো,কিছুটা ঐরকমই | তা হঠাৎ করে ফোন করলে যে ?"
“একটা জরুরি কথা আছে, বরুদা ফোন করেছিলো, বৃষ্টিটা একটু ধরলে আমরা যাচ্ছি |”
-এই বলে সে ফোনটা রেখে দিল, বোঝা গেলো বেশ তাড়াহুড়োতে রয়েছে |
ঘন্টাখানেক পর বৃষ্টি থামলো | আরামকেদারাতে পিঠ ঠেকিয়ে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলাম, আর ঠিক সেই সময় অনিক এবং বরুদা হাজির হলো | খুব রসিক মানুষ আমাদের এই বরুদা | দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতেই বললো, "এবার কি খবরের কাগজটাও মুখস্থ করবে নাকি বাপু |"
অনিক চুপ করে এসে বসলো আমার সামনে চেয়ার টেনে নিয়ে এবং বরুদা আরেকটা চেয়ার টেনে নিয়ে পাশে এসে বসে বললো, "পার্কস্ট্রিটের ঘটনাটা পড়লে অনাদি ?"
“চুরির ঘটনাটা ? হ্যাঁ,কাগজে যত টুকু ছিল ঐটুকুই | চুরি হয়েছে, চোর ধরা পড়েনি, ঘর তছনছ করেছে ইত্যাদি...ইত্যাদি তাইতো ?” আমি বললাম |
“ঘটনাটা কিন্তু এতটাও সহজ নয়, বেশ রহস্যজনক |” বরুদা চোখ পাকিয়ে বললো |
আমি আর অনিক বরুদার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম, বরুদা আবার বলতে শুরু করলো :
“নারায়ণ দেবনাথ আমার জুনিয়ার ছিলো, চাকরি জীবনে বেশ কয়েক বছর তার সাথে কাটিয়েছি | যাইহোক, সে এখন পার্কস্ট্রিট লাগোয়া শেক্সপিয়র সরণি থানার ওসি | সেই এখন এই কেসটা দেখছে | খবরটা পেয়ে আমি ওকে ফোন করি কৌতূহল বসত | সে নাকি কিছু বুঝে উঠতে পারছে না; কেসটা খুবই নাকি ঘোরালো লেগেছে | আমি স্বয়ং ফোন করতে ও খুব খুশি হলো | আর ও এই কেসে আমার সাহায্য চেয়ে আবেদন করলো | ওখানে গেলে নাকি আরও অনেক কিছু জানতে পারবো |”
“বেশ ইন্টারেষ্টিং |”
“এখন বলো তোমরাও যাবে কি ? এই জন্যই অনিককে সাথে নিয়ে সোজা তোমার কাছে চলে এলাম |”
“হ্যাঁ, তেমন কিছুই তো করার নেই এই দুদিন । তবু বইয়ে মুখ গোঁজা থেকে খানিক রেহাই পাওয়া যাবে । যাওয়া যেতেই পারে ।“ আমি বললাম |
“তাহলে আমি ওকে ফোন করে বলে দিচ্ছি আমরা তিনজন যাচ্ছি |”
“তাহলে দরোজায় তালা ঝোলাও অনাদি আর বেরিয়ে পড়া যাক ।“ অনিক বললো |
ব্যাস, সেই যে আমাদের যাত্রা শুরু | তখনও কে জানতো আমাদের জীবন কোনদিকে মোড় নেবে | একদিকে দুই বন্ধুর সঙ্গে বাইরে বেড়োনোর আনন্দ আর সাথে রহস্যের গন্ধ, অন্যদিকে বদ্ধ মাকড়দহের ম্যাড়ম্যাড়ে জীবন | আমাদের মতো রহস্যপ্রিয় মানুষরাই জানে রহস্যের এক সম্মোহনী শক্তি আছে, মায়াবী টান আছে | একবার যাকে রহস্য আর এডভেঞ্চারের মায়াবী টানে টেনেছে তারা দূরে থেকেও থাকতে পারেনা ।
বুঝতে পারছিলাম আমরাও সেই টানে ক্রমেই সম্মোহিত হচ্ছিলাম | অনিকের দিকে তাকিয়েও সেদিন মনে হয়েছিল, তারও ঠিক আমার মতোই অবস্থা । আমরা তো এমন জীবনটাই চাইতাম, যেখানে থাকবে রহস্য, টানটান উত্তেজনা, অশেষ কৌতুহল এবং রোমাঞ্চ । অভিজ্ঞ বরুদার সাথে আমাদের দুই জনের সেই যে অভিযান শুরু ।
বেরিয়ে পড়লাম তিনজনে প্রতিবারের মতোই তবে এবারে স্থির উদ্দেশ্য নিয়ে । কলকাতা শহর পায়ে হেঁটে ঘোরার শহর । শহুরে কোলাহল কে উপেক্ষা করে প্রথমে বাসে করে পার্কস্ট্রিট ওখান থেকে পায়ে হেঁটে শেক্সপিয়র সরণি হয়ে সোজা গেলাম থানায় । থানায় গিয়ে দেখি মাঝারি গড়নের বেশ ফিটফাট একজন পুলিশ অফিসার আমাদেরই অপেক্ষা করছিলেন, বুঝলাম ইনিই নারায়ণ দেবনাথ |
“কেমন আছেন বরুন বাবু ?”
“এইতো দেবনাথ যেমনটা দেখছো, আর তুমি ?” বরুদা হেসে বললো ।
“আর আমি- না পারছি উঠতে- না পারছি বসতে ।“
“তা বটে ,তা বটে |”
“বডিগার্ড নিয়ে ঘুরছেন যে আপনি !” এবার নারায়ণ বাবু হেসে বললেন ।
“হ্যাঁ, এখন এরাই একা বুড়োটার দুটো খুঁটি |”
মুখচোখ আর দেহের গড়ন দেখে বোঝার উপায় নেই ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশোর্ধ | বরুদাকে দেখে তিনি তো খুবই খুশি হলেন, তারপর আমরা যে যার পরিচয় দিলাম | পরিচয়পর্ব শেষ হলে উনি আমাদের ওনার টেবিলের সামনে বসতে বললেন |
“এবার আসল ঘটনায় আসা যাক |” আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন নারায়ণ বাবু |
কাগজটা দিয়ে টেবিলে হালকা আঘাত করে আবার শুরু করলেন, “ব্যাপারটা খুবই রহস্যজনক । আপনারা কাগজে যতটা পড়েছেন তা কিন্তু পুরো ঘটনা নয় |”
“তাহলে পুরো ঘটনাটা কি ?”
তারপর আমরা মনোযোগ দিয়ে নারায়ণ বাবুর কথা শুনতে লাগলাম :
“অরুনলাল সান্যাল একজন প্রতিষ্টিত ধনী ব্যবসায়ী, কলকাতায় বাড়ি করে আছেন বিশ বছর | সাথে থাকেন স্ত্রী ও দুই ছেলে এবং তাঁদের স্ত্রী আর দুই বাচ্ছা | আদি বাসস্থান নদিয়ার পলাশীতে | সেখানে থাকেন তাঁর আরেক ছেলে | কয়েক সপ্তাহ আগে সেই বাড়িতেও নাকি ঠিক এরকমই চুরির চেষ্টা হয়েছে | এবার কালকের কথায় আসা যাক, কালরাতে অরুণবাবুর দুই ছেলে আর বৌমারা গিয়েছিলেন এক অনুষ্ঠানে | ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায় | রাত প্রায় একটার পর ফিরে তাঁরা দেখেন যে, চাকর অজ্ঞান হয়ে পরে আছে দরজার সামনে আর ঘরের হাল লন্ড-ভন্ড, দৌড়ে বুড়ো-বুড়ির ঘরে গিয়ে দেখে তাঁদের হাত-পা-মুখ বাঁধা | তারপর থানায় খবর দেয়, সাথে করে দুই হাবিলদার নিয়ে আমি ঘটনাস্থলে যাই । গিয়ে আমি যা দেখলাম তাতে গায়ে কাঁটা দেয় | অরুণবাবু আর ওনার স্ত্রী মৃনালিদেবী ভয়ে কাঁপছেন, চাকর রামুর তখনও জ্ঞান ফেরেনি | সবকিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একসা; আলমারি থেকে কাগজপত্র বিছিয়ে পরে রয়েছে, সোফা, খাটের তুলো ছিন্ন-ভিন্ন অবস্থায় পরে । মনে হয় চোর যেনো কিছু খুঁজছিলো | আশ্চর্যের বিষয় চোর কিছুমাত্র টাকা ছাড়া আর কিছুই নিয়ে যায়নি | চোর যদি চাইতো তাহলে আরও অনেক কিছুই নিয়ে যেতে পারতো | সামান্য কটা টাকাই যদি নিতে আসতো তাহলে সবকিছু এতো তছনছ কেন করবে ?”
“সিসিটিভি ফুটেজ কি বলছে ?”
“কয়েকদিন থেকেই সিসিটিভি ক্যামেরাটাও খারাপ হয়ে গেছিলো । তবে চোর সেটাকেও ভেঙে দিয়ে গেছে ।“
“তুমি বলছো ওরা ধনী ব্যবসায়ী, তাহলে বাড়িতে সিকিউরিটির ব্যাবস্থা তো থাকা উচিত ।“
“আসলে নাকের ডগায় পুলিশ স্টেশন আর এই এলাকাতে এমনিতেই হাই সিকিউরিটি ব্যাবস্থা থাকে । এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি । তবে এনাদের একজন পাহারাদার ছিলো সে কদিন আগেই দেশের বাড়ি গেছে । কদিন পর আবার ফিরবে । তাই আর ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি ।“
“হুম কেসটা খুবই জটিল, অপরাধ ঘটার জন্য একদম অনুকূল পরিবেশ ছিলো । তবে সেটা পরিকল্পনা মাফিক নাকি কাকতালীয় সেটাই দেখার,” বরুদা বললো |
বরুদার দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে নারায়ণবাবুর দিকে তাকিয়ে অনিক বললো, "যদি তেমনই হতো, চোর নিশ্চয় মার্ডার করা থেকেও পিছুপা হতো না !"
“ওনাদের পলাশীর বাড়িতে যে চুরিটা হয়েছিল তাতে কি কি চুরি হয়েছিল ?”
“হ্যাঁ, অদ্ভুত ব্যাপার সেখানেও কিছুই চুরি যায়নি |”
“আচ্ছা ! ইন্টারেষ্টিং ।“
“আপনি এমন কত কেস অনায়াস দক্ষতায় সমাধান করেছেন । এই কেসে আপনার সাহায্য পেলে কি যে উপকার হয় ।“
আমাদের কথা শেষ হলে নারায়ণ বাবু জেদ ধরলেন তাঁর বাড়িতে যাওয়ার জন্য, “কতদিন পর এসেছেন, আমার বাড়িতে চলুন, ওখানে লাঞ্চ সেরে একবার অরুণবাবুর বাড়িটা ঘুরে আসা যাবে |”
তারপরেও ওদের মধ্যে অনেক কথা হতে লাগল কিন্তু তাতে কোনো আমার ভ্রূক্ষেপ ছিলোনা । তখনও আমার মনে চলছিল বেশ কিছু প্রশ্ন |
পরবর্তী অংশ আগামী পর্বে...
অবশ্যই আপনাদের মতামত জানাবেন এই ঠিকানায় :